স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তাবিত সংশোধনী গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক, ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
ঋণখেলাপিদের বিষয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দ্বৈত নাগরিকদের কেন?
যে প্রবাসীরা বছরের পর বছর ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করেন এবং সংকটের সময় দেশের পাশে দাঁড়ান, তাঁদের কি শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্যই নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে? দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার অধিকার থাকবে, কিন্তু দেশের নেতৃত্বে অংশ নেওয়ার অধিকার থাকবে না—এ কেমন গণতন্ত্র?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একজন দ্বৈত নাগরিক যদি বাংলাদেশের ভোটার হন, ভোট দিতে পারেন, রাষ্ট্রের নানা দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করার সাংবিধানিক ও নৈতিক ভিত্তি কোথায়? ভোটার হিসেবে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু প্রার্থী হিসেবে অগ্রহণযোগ্য—এ কেমন দ্বৈত মানদণ্ড?
আরও বিস্ময়ের বিষয়, জাতীয় রাজনীতিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নানা সময়ে বিতর্ক থাকলেও, বিভিন্ন পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের নজির রয়েছে। অথচ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব বৈষম্যের প্রশ্নকে আরও জোরালো করে।
এ প্রস্তাবে আরেকটি বড় ঘাটতি স্পষ্ট। জনপ্রতিনিধিদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। স্থানীয় সরকার পরিচালনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও জ্ঞানের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে কেবল নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রার্থিতা সীমিত করা কোনো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো অংশগ্রহণ, বঞ্চনা নয়। প্রবাসীরা এই দেশেরই সন্তান। তাঁদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও ভালোবাসায় বাংলাদেশের অর্থনীতি আজও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো বিবেচনা করা হলে তা শুধু অন্যায় নয়, জাতীয় স্বার্থেরও পরিপন্থী।
আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই—নির্বাচন কমিশনের এই বৈষম্যমূলক প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা হোক। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা, সমান রাজনৈতিক অধিকার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।
মনে রাখতে হবে—গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন রাষ্ট্র তার সব নাগরিককে সমান চোখে দেখে। প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স যোদ্ধা নন; তাঁরা এই দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। তাঁদের ভোট যদি মূল্যবান হয়, তবে তাঁদের প্রার্থিতাও সমানভাবে মূল্যবান হওয়া উচিত।