জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অন্তত ৭টি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় এসব সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেখানে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে এই বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেই বিলবোর্ড বদলানো হয়। সেখানে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
তবে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সোমবার সেখানে ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘জুলাই জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী চলছিল। প্রদর্শনীতে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে কয়েকজনের ছবি প্রদর্শন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবিসংবলিত ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা গিয়ে ব্যানারটি সরাতে বলে। এ নিয়ে প্রথমে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। এর জেরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
সোমবারের এই সংঘর্ষের পর বেরোবিতে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল—দুই পক্ষই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে দর্শনার্থী ও সব ধরনের যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা জারির জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়।
এরই মধ্যে গতকাল বিকেলে রংপুর মহানগর ও জেলা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে বেরোবির প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। তাঁরা যুদ্ধাপরাধী, ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। এ সময় তাঁদের হাতে প্লাস্টিকের পাইপ, বাঁশের লাঠি দেখা যায়। গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বেরোবির সামনে অবস্থান করতে দেখা যায়।
এদিকে বিকেল সাড়ে ৫টায় মহানগর ও জেলা ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা লালবাগ মোড়ে জড়ো হন। তাঁরাও হামলার ঘটনার প্রতিবাদে নানা স্লোগান দেন। লালবাগ থেকে আবু সাঈদ চত্বরে বিক্ষোভ নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তাঁরা লালবাগ থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাপলা চত্বরে যান। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে পর সন্ধ্যা ৭টায় কর্মসূচি শেষ করেন।
এদিকে বেরোবির সোমবারের সংঘর্ষের ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ভিডিও ফুটেজসহ সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেবোরির সোমবারের সংঘর্ষের আঁচ লাগে গতকাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। গতকাল দুপুরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু), জাতীয় ছাত্রশক্তি ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জকসুর নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, অস্থায়ী হল নির্মাণ এবং মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেমিনারে প্রবেশ করতে চাইলে বাধা দেওয়া হয়। পরে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালের সামনেও দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের ভেতরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও চিকিৎসকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জাতীয় ছাত্রশক্তির জবি শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস এবং ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখকে মারধর করেন। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় ছাত্রশক্তির ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন।
তবে জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইউজিসির চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও সহযোগী সংগঠনগুলো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে ছাত্রদলেরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ন্যাশনাল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার মকবুল হোসেন বলেন, বিকেল ৬টা পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি আহত ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের পর ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জুলাইয়ের একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। পরে কয়েক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে ছাত্রদলের ধাওয়ায় শিবিরের নেতা-কর্মীরা কলেজ এলাকা ছেড়ে চলে যান।
ঢাকা কলেজ ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ মামুন অভিযোগ করেন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভার প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। এতে শিবিরকর্মী আব্দুল মালেক আহত হন।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মিল্লাদ হোসেন বলেছেন, ‘এই ক্যাম্পাসে শিবিরকে রাজনীতি করতে দেব না।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সামনেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বিকেলে শুরু হওয়া সংঘর্ষ প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় কয়েকজন আহত হন এবং চানখাঁরপুল এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
ছাত্রশিবিরের দাবি, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলে ঢুকে তাঁদের ওপর হামলা চালান এবং কয়েকটি কক্ষে তালা দেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের অভিযোগ, শিবির হলের কক্ষ দখল করে রেখেছে এবং তাদের কর্মীদের ওপর হামলা করেছে।
আলিয়া মাদ্রাসা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুল আলিম বলেন, ছাত্রদলের হামলায় তাঁদের প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন।
তবে ছাত্রদলের নেতা সাদ চৌধুরী দাবি করেন, শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষে ছাত্রদল ও যুবদলের প্রায় ১৮ জন আহত হয়েছেন।
ঢাকার বাইরে বরিশালে বিএম কলেজেও এমন ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে বিকেলে ছাত্রদলের একদল নেতা-কর্মী ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (মুসলিম) ও অশ্বিনী কুমার (ডিগ্রি) ছাত্রাবাস থেকে কয়েকজন শিবিরকর্মীকে মারধর করে বের করে দিয়েছেন। তবে ছাত্রদল দাবি করেছে, সাধারণ ছাত্ররা গুপ্তদের হল থেকে বিতাড়িত করেছেন।
এদিকে বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঢাকার অন্য কলেজগুলোতেও। সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিবির নেতা-কর্মীদের মারধর করে বের করে দিয়েছে ছাত্রদল। এ ছাড়া সরকারি বাঙলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ ও কাজী নজরুল ইসলাম কলেজে ছাত্রদল বিক্ষোভ করেছে।
ঢাকার শিক্ষাঙ্গনগুলোয় সংঘর্ষের পর এসব ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেসব এলাকায় ঝামেলা হয়েছিল, সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।