দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের মধ্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রস্তাবিত এই রেললাইন বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু শরীয়তপুর বা হিজলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে নদীবেষ্টিত মেহেন্দিগঞ্জও এর অন্যতম বড় উপকারভোগী হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে পাঠানো নির্দেশনায় পদ্মা সেতুর মাধ্যমে শরীয়তপুর সদর, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাট হয়ে বরিশালের হিজলা পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
মেহেন্দিগঞ্জের পার্শ্ববর্তী উপজেলা হিজলা। মাঝখানে রয়েছে কালাবদর ও ধর্মগঞ্জ নদী। যদি এই দুই উপজেলার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করা যায়, তাহলে মেহেন্দিগঞ্জ প্রথমবারের মতো দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগে যুক্ত হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হিজলা পর্যন্ত রেললাইন বাস্তবায়িত হলে সেই রেল সংযোগও সহজেই মেহেন্দিগঞ্জবাসীর নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
বর্তমানে মেহেন্দিগঞ্জের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ। স্থল যোগাযোগ না থাকায় নদীর তলদেশ দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন এনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নৌযান দুর্ঘটনা কিংবা অন্যান্য কারণে এসব লাইন প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে পুরো উপজেলা। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পকারখানা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সেতু নির্মাণ হলে স্থলপথে বিকল্প ও আরও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মেহেন্দিগঞ্জের মানুষকে এখনো ঢাকায় যেতে প্রধানত নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। লঞ্চে যেতে সময় লাগে প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা, খরচও তুলনামূলক বেশি। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে বাজারদরে। একই কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প বিনিয়োগ এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা থেকেও দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে মেহেন্দিগঞ্জ।
স্থানীয়দের মতে, হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ সেতু নির্মিত হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগের সুবিধাও মেহেন্দিগঞ্জের মানুষ ভোগ করতে পারবেন। এতে বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র।
উল্লেখ্য, এর আগে সাবেক সংসদ সদস্য পংকজ নাথ মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সরকারি পর্যায়ে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ ও প্রাথমিক জরিপের কাজও সম্পন্ন হয়েছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের দিকে এগোয়নি।
বর্তমানে মেহেন্দিগঞ্জের সংসদ সদস্য রাজিব আহসান একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হিজলা পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্পের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তিনি উদ্যোগ নিলে বহুদিনের প্রত্যাশিত মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা সেতু নির্মাণ বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
মেহেন্দিগঞ্জবাসীর বিশ্বাস, এই সেতু শুধু দুই উপজেলার মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপন করবে না; বরং বিদ্যুৎ সংকট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, উচ্চ পরিবহন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়ার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার টেকসই সমাধানের পথও খুলে দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক ও সম্ভাব্য রেল যোগাযোগের মাধ্যমে মেহেন্দিগঞ্জের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।