দক্ষিণবঙ্গের মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও অভিযোগ থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার হিরা মাঝী। স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—গৌরনদী উপজেলায় মাদক ক্রয়-বিক্রয়ের যে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কথা বলা হয়, সেটি কি শুধুই একজনের নিয়ন্ত্রণে, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে আরও একাধিক মাদক কারবারি?
২০২২ সালের প্রতিবেদনে হীরা মাঝি ও তাঁর ভাই মানিক মাঝির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন মাদক ব্যবসা ও একটি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ এবং মানিকের ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে হীরা মাঝিকে আবারও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনের বর্ণনাগুলোর সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে হীরাকে ঘিরে সাব-ডিলারদের নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং গৌরনদীতে তাঁর চেয়েও বড় কারবারি থাকার দাবি স্থানীয় সূত্রগুলো করেছে। একই প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে—এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
আরেকটি প্রতিবেদনে হীরা ও মানিককে ঘিরে শতাধিক সাব-ডিলার থাকার অভিযোগ করা হলেও সেটিও সূত্রনির্ভর দাবি, প্রমাণিত সরকারি তথ্য নয়।
মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে একসময় গৌরনদী উপজেলায় মাদক ক্রয়-বিক্রয়ের বিভিন্ন স্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনুসন্ধানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৬৬টি মাদক ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতগুলো স্থানে মাদক কেনাবেচা হয়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এসব স্থানের সবগুলো কি একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে, নাকি পৃথক পৃথক চক্র এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন সময়ে ১০, ২০, ৫০, ১০০ থেকে শুরু করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ কথিত মাদক কারবারিদের গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলাও দায়ের করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোট পরিমাণের মাদকসহ আটক ব্যক্তিদের কারও কারও বক্তব্যে হিরা মাঝীর নাম উঠে আসার অভিযোগ থাকলেও বড় চালান বা বড় পরিসরের মাদক সরবরাহের সঙ্গে কারা জড়িত—সে বিষয়ে জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য সবসময় আসে না। ফলে মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের শনাক্ত করা নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে হিরা মাঝীর নাম ব্যবহার করে কিছু নতুন মাদক কারবারি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত ভূমিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, মাদক নির্মূলে শুধু আলোচিত কোনো একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অভিযান পরিচালনা না করে পুরো মাদক সরবরাহব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট চক্রকে চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করে তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অপরদিকে এ বিষয়ে হিরা মাঝীর সাথে কথা হলে তিনি জানায় কিছুদিন পূর্বে একটি নিয়মিত মামলায় জেলহাজত থেকে জামিনে আসার পর থেকেই মাদক ক্রয় ও বিক্রয়ের সাথে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই, বর্তমান সময়ে আমার নাম ব্যবহার করে কেউ যদি মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে তবে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি (হিরা মাঝী)।
এ বিষয়ে বতর্মানে গৌরনদী মডেল থানায় কর্মরত অফিসার ইনচার্জ মোঃ তারিক হাসান রাসেল বলেন আমাদের কাছে মাদক চক্রের একটি তালিকা রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চলমান রয়েছে,যেকোনো সময় তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে।
“ তবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কারা এর পেছনে অর্থ, সরবরাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে—তা প্রশাসনের বিচক্ষণ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
সুতরাং হীরা মাঝি এই কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম, কিন্তু প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে “দক্ষিণবঙ্গের পুরো মাদক সাম্রাজ্য = শুধু হীরা মাঝি”—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। বরং সরবরাহকারী, আঞ্চলিক ডিলার, সাব-ডিলার এবং সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষকদের স্তরগুলো আলাদাভাবে তদন্ত করা দরকার।