আধুনিক বিশ্বের প্রথম শহর হিসেবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই হয়তো সম্পূর্ণ পানিশূন্য হয়ে পড়তে যাচ্ছে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল। তবে তথাকথিত সেই 'ডে জিরো' বা পানি ফুরিয়ে যাওয়ার হিসাবটি অনেকের জন্য কেবল কাগজের কলমে আটকে থাকা কোনো ভবিষ্যৎ বাণী নয় বরং কাবুলের বহু বাসিন্দার জীবনে এই বিভীষিকা ইতিমধ্যেই এক নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও পরিবেশ গবেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বছরের পর বছর ধরে চলা ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে কাবুলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এত দ্রুত নিচে নামছে যে পুরো শহরটি এখন এক অবর্ণনীয় অমীমাংসিত মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
কাবুলের খাইর খানা এলাকায় বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী শাদিয়া তেমনই এক করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি। তিন সন্তান ও হকার স্বামীকে নিয়ে তার সংসার। ঘরে তাদের কোনো ট্যাপের পানির সংযোগ নেই, আবার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ট্যাঙ্কারগুলোর কাছ থেকে চড়া দামে পানি কেনার সাধ্যও তাদের নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে শাদিয়া ও তার ছোট ছোট সন্তানদের প্রতিদিন কাছের এক মসজিদে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে নলকূপ চেপে পানি সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিদিনের এই ভারী বালতি ও ক্যান বহনের শারীরিক যন্ত্রণায় শাদিয়ার পিঠে তীব্র ব্যাথা শুরু হয়েছে। সন্তানরা যখন স্কুলের পর একটু খেলাধুলার সুযোগ পাওয়ার কথা, তখন তাদের পানির বালতি টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এ নিয়ে শাদিয়া কষ্ট পান কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।
কাবুলের এই পরিস্থিতি কেবল একটি একক দেশের ঘটনা নয় বরং টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টি থেকে শুরু করে ইরানের তেহরানের মতো বিশ্বজুড়ে একাধিক আধুনিক নগরী আজ একই ধরনের পানি সংকটের প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে। তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা 'প্রস্পর গ্লোবাল'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকির দিক দিয়ে অত্যন্ত নাজুক অবস্থান, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ২০২১ সালে তালেবান শাসকদলে আসার পর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার দরুন কাবুলের অবস্থা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের চেয়ে বেশি শোচনীয়। জাতিসংঘের বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথ-এর অধ্যাপক মোহাম্মদ ফৈজি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, শহরটি এক বিরাট মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে এবং বিপর্যয় এড়াতে হাতে আর খুব সামান্য সময় বাকি আছে।
কাবুলের ভৌগোলিক অবস্থান মূলত হিন্দু কুশ হিমালয় পর্বতমালার কোল ঘেঁষে। শীতকালের তুষারপাত এবং পর্বত থেকে নেমে আসা বরফগলা পানি কাবুল নদীকে সচল রাখত এবং শহরের ৮০ শতাংশ মানুষের পানির প্রধান উৎস ভূগর্ভস্থ একুইফার বা শিলাস্তরকে রিচার্জ বা পুনর্পূরণ করত। কিন্তু বিগত এক দশকে কাবুলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ১০০ ফুট নিচে নেমে গেছে। চাহিদার তুলনায় প্রতি বছর কাবুলের পাতাল থেকে পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুটের বেশি। জাতিসংঘের তথ্যমতে, আফগানিস্তান টানা ছয় বছর ধরে তীব্র খরা সহ্য করছে এবং গত বছরের শীত মৌসুমে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তুষারপাত নথিভুক্ত হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, বৃষ্টিপাত হলেও কাবুলের পাকা রাস্তাঘাট ও কংক্রিটের কারণে পানি মাটিতে শোষিত না হয়ে উল্টো ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে মানুষ ও ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জার্মানিভিত্তিক আফগান পানি ও পরিবেশ গবেষক নাজিবুল্লাহ সাদিদ এই তীব্র পরিস্থিতিকে কেবল সাময়িক সংকট বলতে রাজি নন; তাঁর মতে, এটি 'পানি দেউলিয়াত্ব'। যেখান থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি আর কোনোভাবেই ফেরত আনা সম্ভব নয়।
ভূগর্ভস্থ পানির এই অস্বাভাবিক পতনের অন্যতম বড় কারণ হলো কাবুলের অনিয়ন্ত্রিত ও উলম্ব বা ভার্টিক্যাল প্রসার। ২০০১ সালে যেখানে কাবুলের জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখের কম, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ লাখে। গ্রামের খরা, প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ইরান থেকে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন এবং কর্মসংস্থানের খোঁজে মানুষ এই শহরে ভিড় জমিয়েছে। আবাসিক ভবনে এক তলার স্থানে এখন বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, যার ফলে এক প্লটের জায়গায় কয়েক ডজন পরিবার একই ভূগর্ভস্থ কূপ থেকে পানি উত্তোলন করছে। কার্তে নাও এলাকার বাসিন্দা সাইদ আগা জানান, তাদের ১৪ পরিবারের বহুতল ভবনে মাত্র একটি কূপ রয়েছে, যা প্রতি কয়েক মাস পরপরই শুকিয়ে যায়। অধিকাংশ সময় কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি মেলে, আর কখনো কখনো দিনের পর দিন পানির দেখা পাওয়া যায় না। পেশাগত কারণে কাবুল ছাড়তে না পারা এই বাসিন্দারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
পানি সংগ্রহের এই বিপর্যয় সাধারণ মানুষের পকেটেও টান ফেলছে গভীরভাবে। শহরের আরেক বাসিন্দা আসাদুল্লাহ আহমদী জানান, তার সাত সদস্যের পরিবারের জন্য দৈনিক খাবার পানি জোগাড় করতেই অন্তত ১৫০ আফগানি (প্রায় ২.৩৫ ডলার) ব্যয় করতে হয়, যা তার আয়ের একটি বিশাল অংশ। তা সত্ত্বেও সেই পানি বিশুদ্ধ নয়, ফুটিয়ে খেতে হয়। প্রস্পর গ্লোবাল-এর সাবেক কর্মকর্তা মারিয়ানা ভন জন জানান, সাধারণ মানুষের এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির বেসরকারি ট্যাঙ্কার ব্যবসায়ী অত্যন্ত চড়া দামে পানি বিক্রি করছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, একটি পরিবারের আয়ের সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পানির পেছনে খরচ হওয়া স্বাভাবিক, সেখানে কাবুলের দরিদ্রতম মানুষেরা তাঁদের মোট আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কেবল পানির পেছনেই উজার করে দিচ্ছেন। এর ওপর আবার ভূগর্ভস্থ পানির প্রায় ৮০ শতাংশই পয়ঃবর্জ্য এবং প্রাকৃতিক আর্সেনিক দ্বারা মারাত্মকভাবে দূষিত।
সঙ্কট মোকাবিলায় তালেবান সরকারের জ্বালানি ও পানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মতিউল্লাহ আবিদ জানিয়েছেন, শাহ ওয়া আরুস বাঁধের নির্মাণ শেষ হয়েছে এবং শাহতুত বাঁধ ও পাঞ্জশির নদী থেকে ১২৪ মাইলের দীর্ঘ পাইপলাইনের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবে রূপ নিতে বহু বছর সময় লাগবে, যা বাস্তবায়নের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর নেই। এদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় মানবিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা একেবারে বন্ধ হয়ে আছে।
গতকাল ও আজকের এই ধীরগতির 'ডে জিরো' কাবুলের মানুষকে এক চরম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। অতীতে যারা বোমা ও রকেটের আঘাত থেকে বাঁচতে কাবুল শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, জীবনের তাগিদে আজ পানি না পেয়ে তাদেরই এই প্রিয় শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ