কাজ শেষ না হওয়া প্রকল্প
দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) সংবাদদাতাপঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) অধীনে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ না হওয়ায় স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতি এবং বারবার সময় বাড়ানোর (টাইম এক্সটেনশন) পরেও অনেক প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আইআরআইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় খড়খড়ি নদীর ওপর পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের কাজ পায় চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবর কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম দফায় ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের টুলো-টু। প্রকল্পের আওতায় দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস ভবন নির্মাণের কাজ পায় পঞ্চগড় সদরের মেসার্স প্রধান এন্টারপ্রাইজ। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের অগ্রগতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। পরে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সংশ্লিষ্টরা কাজ পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতার কথা জানিয়েছেন।
একই প্রকল্পের আওতায় দেবীডুবা ইউনিয়ন ভূমি অফিস ভবন নির্মাণের কাজ পায় মেসার্স সোহান ট্রেডার্স। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এর ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশ। কাজ শেষ করতে সময় বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার আবেদন করেছেন।
অন্যদিকে, টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস ভবন নির্মাণকাজে অগ্রগতি আরো কম। মেসার্স সুমন ট্রেডার্সের কাজটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় ইতোমধ্যে সময় বাড়ানো হয়েছে এবং পুনরায় মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে।
এ ছাড়া জিডিডিআরআইডিপি প্রকল্পের আওতায় পামুলী ইউনিয়নে ৫০ দশমিক ১০ মিটার আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের কাজ পায় রাজশাহীর বরেন্দ্র কন্সট্রাকশন। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া কাজটি ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে সময় বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৮৫ শতাংশ।
ভোগান্তিতে স্থানীয়রা, সরেজমিনে দেখা যায়, উন্নয়নকাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়ছে। দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় জরাজীর্ণ পুরোনো ভবনেই দাফতরিক কার্যক্রম চলছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
পামুলী ইউনিয়নের নির্মাণাধীন সেতুটিও স্থানীয় যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিরহাট ও দেবীডুবা ইউনিয়নের লক্ষীরহাট এলাকায় কৃষিপণ্য, বিশেষ করে বাদাম কেনাবেচাকে ঘিরে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় পণ্য পরিবহনে ট্রাক চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হলে দণ্ডপাল, সুন্দরদিঘী ও পামুলী ইউনিয়নের সাথে বোদা উপজেলার যোগাযোগ আরো সহজ হবে। একই সাথে কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।
তদারকি নিয়ে প্রশ্ন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পঞ্চগড় জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডিজার হোসেন বাদশা বলেন, ‘কাজের অগ্রগতি কম থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে বারবার সময় বাড়ানো হলে ঠিকাদাররা কাজ ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ পান। প্রকৌশলীর দায়িত্ব শুধু সময় বাড়ানো নয়, সময়মতো কাজ শেষ করিয়ে নেয়াও। এভাবে কাজ দীর্ঘায়িত হলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও উন্নয়নকাজের সুফল থেকে বঞ্চিত হন।’
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আনোয়ারুল হক প্রধান বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী কাজ না হলে এবং বারবার মেয়াদ বাড়ানো হলে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে কাজের যথাযথ তদারকি ও বুঝে নেয়ার ক্ষেত্রে উপজেলা প্রকৌশলীরও দায়িত্ব রয়েছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো: শাহরিয়ার ইসলাম শাকিল বলেন, ‘মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি জেলা কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। ঠিকাদারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম অনুযায়ী সময় বাড়ানো হয়। ইউনিয়ন ভূমি অফিস ভবনের কিছু কাজ সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে থেমে আছে। ’
সোনাহার ও পামুলীর সেতুর কাজ দ্রুত শেষ হবে বলেও জানান তিনি।
এলজিইডি পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: সফিউল আলমকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
দিনাজপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নারায়ণ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলীর সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত সাহা বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গুণগত মান বজায় রেখে প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হবে। একই সাথে উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়কে যথাযথ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
এদিকে, দেবীগঞ্জে যোগদানের পর তিন বছর অতিবাহিত হওয়ায় সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশলী শাহরিয়ার ইসলাম শাকিলের বদলি আদেশ হলেও তা পরবর্তীতে বাতিল হওয়ার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। তবে ওপর মহলকে ম্যানেজ করে বদলি বাতিল—এমন অভিযোগের স্বপক্ষে প্রতিবেদনে কোনো প্রামাণ্য তথ্য না থাকায় বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখযোগ্য।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত ১৯৮৩ সালের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে একই কর্মস্থল বা একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বদলি বাতিলের প্রক্রিয়া ও কারণ নিয়েও স্বচ্ছ ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।