অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্বে ছত্রিশে জুলাইয়ের (৫ আগস্ট) দিন যখন হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত রাজপথ, তখন ভরদুপুরে দেশের আকাশসীমা ছাড়ছেন স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। জনরোষ থেকে বাঁচতে সামরিক বিমানে পালিয়ে যাওয়ার সময় আকাশপথের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার যাত্রায় কেমন ছিল তার অভিব্যক্তি। বিমানে বসে সহযাত্রী, ক্রু কিংবা নিরাপত্তাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি কী বলেছিলেন। তাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া কর্মকর্তারাই বা এখন কোথায়। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যুগান্তর।
সাবেক ও বর্তমান সামরিক সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে হাসিনার ভারত যাত্রা সম্পর্কে বিচ্ছিন্নভাবে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারোরই আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্পর্শকাতর বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেলেও যুগান্তরের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সেগুলো যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
৫ আগস্ট সকাল ১০টা। শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে লাখো মানুষ প্রবেশ করে রাজধানীতে। একপর্যায়ে পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে গণভবনের দিকে অগ্রসর হয় জনস্রোত। দুপুরের আগেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে হাসিনাকে মাত্র ৩০ মিনিট সময় বেঁধে দিয়ে দ্রুত গণভবন ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপরই বাণিজ্যমেলার কাছাকাছি এসে নামে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার (এমআই-১৭)। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর হাসিনা ও তার বোন রেহানাকে নিয়ে হেলিকপ্টারটি পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে উড়াল দেয়।
সূত্র জানায়, গণভবন থেকে হাসিনা ও তার বোনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হেলিকপ্টারের পাইলট এবং কো-পাইলট ছিলেন যথাক্রমে এয়ার কমোডর আব্বাস ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। বিকাল তিনটা নাগাদ হেলিকপ্টারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে অবতরণ করে। এ সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরে কর্তব্যরত উইং কমান্ডার কানিজ ফাতেমা সংক্ষিপ্ত বেতার বার্তায় রেসকিউ মিশনের অধীনে সামরিক হেলিকপ্টার উড্ডয়নের বিষয়টি ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোলে জানান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টি ছিল কঠোর গোপনীয়তায় ঘেরা। বিশেষ করে তাকে গণভবন থেকে নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন অতি বিশ্বস্ত সেনা কর্মকর্তাকে জানানো হয়। মিশন বাস্তবায়নে বিমানবাহিনীর স্পেশাল ফ্লাইং ইউনিটের ডাক পড়ে। এছাড়া হাসিনা ও তার বোনকে রিসিভ করতে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজের তৎকালীন কমান্ডার নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে আগে থেকেই ইঞ্জিন চালু অবস্থায় একটি সামরিক পরিবহণ বিমান (সি-১৩০ জুলিয়েট) অপেক্ষমাণ ছিল। এ সময় বিমানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন হাসিনার তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, তার স্ত্রী শাহিন সিদ্দিকী, তাদের দুকন্যা এবং জামাতা।
অবতরণের পর হেলিকপ্টার থেকে নেমে শেখ হাসিনা উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেন। তিনি আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তাকে গণভবনমুখী জনস্রোত এবং অভ্যুত্থান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়। ফলে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি স্বৈরশাসন অবসানের খবর পেয়ে যান।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পর ক্রু এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে বিমানটি পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসে। পরে পাইলট এয়ার কমোডর শামীম রেজাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য ফিলিপাইনে পাঠানো হয়। তবে কো-পাইলট উইং কমান্ডার মাহফুজ বর্তমানে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা পরিদপ্তরে কর্মরত রয়েছেন।
একটি সামরিক সূত্র যুগান্তরকে জানায়, গণভবন থেকে হাসিনার রেসকিউ মিশন প্রধানত দুটি অংশে পরিচালিত হয়। প্রথম ভাগে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে নিরাপদে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে স্থানান্তর। এরপর সেখান থেকে তাকে সামরিক বিমানে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত রেসকিউ মিশনের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি। তিনি ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহসভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফির ছেলে।