জিবিএন বাংলা

যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশায় মুখ থুবড়ে পড়ছে নেছারাবাদের অর্থনীতি



যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশায় মুখ থুবড়ে পড়ছে নেছারাবাদের অর্থনীতি
নিজস্ব প্রতিনিধি

পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) একসময় ছিল দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাণবন্ত ব্যবসায়িক জনপদ। কাঠের মোকাম, পেয়ারা, ফার্নিচার, রশি, নারকেলের ছোবড়ার আঁশ, নার্সারি ও কৃষিপণ্য ব্যবসার পাশাপাশি নৌপথকেন্দ্রিক বাণিজ্যের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিল এ উপজেলার পরিচিতি। স্বরূপকাঠি, মিয়ারহাট ও ইন্দুরহাট বন্দরে প্রতিদিন ভিড় করতেন ব্যবসায়ী, পাইকার ও ক্রেতারা। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সড়ক ও সেতু যোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও নেছারাবাদ পিছিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নয়ন বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে উপজেলার শতবর্ষের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে নেছারাবাদকে একাধিক সংসদীয় আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমে বানারীপাড়া–স্বরূপকাঠি, পরে ভাণ্ডারিয়া–কাউখালী–নেছারাবাদ এবং পিরোজপুর–নাজিরপুর–নেছারাবাদ আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে নেছারাবাদ–কাউখালী–ভাণ্ডারিয়া নিয়ে সংসদীয় আসনের বিন্যাস হয়েছে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, আশপাশের বানারীপাড়া, কাউখালী, ভাণ্ডারিয়া, নাজিরপুর ও পিরোজপুর সদর উপজেলায় গত দুই দশকে সড়ক, সেতু ও অবকাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও নেছারাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতুগুলো এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হয়নি। ফলে এর প্রভাব পড়ছে মানুষের চলাচল থেকে শুরু করে কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর।

বিশেষ করে সন্ধ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ের ছয়টি ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, এ অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য প্রধান সড়কের অভাব রয়েছে। অনেক সড়কের পিচ উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। বর্ষাকালে ভাঙা অংশে পানি জমে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। কোথাও পুরোনো সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, আবার কোথাও সেতু নির্মাণ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় কাঠের সিঁড়ি দিয়ে মানুষকে সেতুতে উঠতে হয়।

অটোচালক রফিক বলেন, “বেশিরভাগ সড়কের পিচ উঠে গেছে। অসংখ্য খানাখন্দ রয়েছে। বর্ষায় পানি জমে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সড়ক ও সেতুর এই অবস্থার কারণে যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে।”

পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা তাহের বলেন, “আমাদের অঞ্চলে এমন একটি প্রধান সড়কও নেই, যেটাকে নির্ভরযোগ্য বলা যায়। এতে চলাচল, কৃষিপণ্য পরিবহন ও চিকিৎসাসেবায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”

যোগাযোগ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নেছারাবাদের ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতে। একসময় নাজিরপুর, বানারীপাড়া, উজিরপুর, কাউখালী ও ঝালকাঠিসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নিয়মিত স্বরূপকাঠি, মিয়ারহাট ও ইন্দুরহাটে আসতেন। কাঠ, কৃষিপণ্য, মাছ, ফলমূল ও আসবাবপত্রের বেচাকেনায় জমজমাট থাকত এসব বাজার।

কিন্তু আশপাশের উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে নতুন বাজার গড়ে ওঠায় বাইরের ক্রেতা ও পাইকারদের একটি বড় অংশ এখন নিজ নিজ এলাকার বাজার থেকেই পণ্য সংগ্রহ করছেন।

মুদিখানা ব্যবসায়ী জলিল বলেন, “আগে আশপাশের উপজেলা থেকে ক্রেতা ও পাইকাররা নেছারাবাদের বাজারে আসতেন। এখন অনেকেই নিজের এলাকার বাজার থেকেই পণ্য কিনে নিচ্ছেন। যোগাযোগ ভালো না থাকায় বাইরের ক্রেতাদের আগ্রহও কমে গেছে।”

নেছারাবাদের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে স্বরূপকাঠির কাঠের মোকাম। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকা ও ট্রলারে করে বিপুল পরিমাণ গোল কাঠ আসত এখানে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা স্বরূপকাঠি থেকে কাঠ কিনে নিয়ে যেতেন।

প্রবীণ কাঠ ব্যবসায়ী জব্বার মিয়া বলেন, “একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঠ এখানে আসত। পাইকাররা স্বরূপকাঠি থেকে কাঠ কিনে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যেতেন। এখন সেই আগের মতো বেচাকেনা নেই।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন কাঠ উৎপাদনকারী এলাকায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় পাইকাররা এখন সরাসরি উৎপাদন এলাকায় গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করছেন। অন্যদিকে নেছারাবাদের সঙ্গে বরিশাল, ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের স্থল যোগাযোগ এখনও দুর্বল। সংকীর্ণ সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু এবং বড় ট্রাক চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে কাঠ পরিবহন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে।

ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, “যোগাযোগের সমস্যার কারণে অনেক পাইকার এখন স্বরূপকাঠির মোকাম থেকে পণ্য না নিয়ে সড়ক যোগাযোগ সুবিধাসম্পন্ন উৎপাদন এলাকায় সরাসরি যাচ্ছেন।”

নেছারাবাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আরেকটি দিক হলো স্বরূপকাঠির বিসিক শিল্পনগরী। ১৯৬৪ সালে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীতে এখন পর্যন্ত মাঝারি বা বড় ধরনের উল্লেখযোগ্য শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। স্থানীয়দের মতে, উন্নত যোগাযোগ ও বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামোর অভাব শিল্পায়নের অন্যতম বাধা।

নেছারাবাদবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—নেছারাবাদ–বরিশাল ও নেছারাবাদ–পিরোজপুর সড়ক প্রশস্ত ও আধুনিকায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুর পরিবর্তে ভারী যান চলাচল উপযোগী নতুন সেতু নির্মাণ, পশ্চিম পাড়ের ছয় ইউনিয়ন সহ নেছারাবাদের সড়কগুল দ্রুত সংস্কার এবং পশ্চিম পাড় থেকে পিরোজপুরে সরাসরি বাস যোগাযোগ চালু করা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব অবকাঠামো উন্নয়ন হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য, কাঠ, পেয়ারা, ফার্নিচার ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত ও কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে বাইরের পাইকার ও ক্রেতারা আবারও নেছারাবাদের বাজারমুখী হবেন এবং মিয়ারহাট, ইন্দুরহাট ও স্বরূপকাঠির হারানো বাণিজ্যিক গুরুত্ব ফিরে আসবে।

বর্তমান সংসদ সদস্য ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সোহেল মঞ্জুর সুমনকে ঘিরে উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, পিরোজপুর-২ (নেছারাবাদ–কাউখালী–ভাণ্ডারিয়া) আসনে তাঁর বিজয়ে নেছারাবাদের ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে তাঁর কার্যকর ভূমিকা চান তারা।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী সোহেল মঞ্জুর সুমন বলেন, “এই জনপদ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও অবগত। এখানে উন্নয়নে কতটা বৈষম্য হয়েছে, সেটিও তিনি জানেন। বিগত সরকার ১৭ বছরে এই অঞ্চলের কোনো কাজ করেনি। কাজ না করে উন্নয়নের অর্থ তুলে নিয়েছে। আমরা নিতে আসিনি, দিতে এসেছি।”

তিনি বলেন, “নেছারাবাদ উপজেলার ভোটারদের ভোটে আমি নির্বাচিত হয়েছি। মামলার কারণে এই এলাকার উন্নয়নের কাজ বন্ধ ছিল। ইনশাআল্লাহ, সেই মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। খুব শিগগিরই উন্নয়নের কাজ শুরু হবে।”

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “সন্ধ্যা নদীর ওপর নেছার উদ্দিন সেতু ও কাউখালী–নেছারাবাদ চ্যানেলে সেতু নির্মাণের কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। এছারাও এই উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমী, খেলার জন্য স্টেডিয়াম সহ নানা মুখী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হবে, নেতাকর্মী ও আমলাদের প্রতি অনুরোধ, কেউ উন্নয়নের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। যেখানে যতটুকু কাজ করা যায়, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন।”তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি কাজের সহযোগিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

ফিরতে পারে হারানো বাণিজ্যিক গৌরব

স্থানীয় ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমজীবীদের মতে, নেছারাবাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক করা গেলে কাঠ, কৃষিপণ্য, পেয়ারা, নার্সারি, ফার্নিচারসহ ঐতিহ্যবাহী খাতগুলো আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

কৃষক ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ী রমেশ বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে আমাদের পণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া যাবে। পরিবহন খরচ কমবে এবং বাইরের পাইকাররা আবারও আসবেন। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই লাভবান হবে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি আরও কমবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হবে এবং সরকারও হারাবে রাজস্ব। অন্যদিকে পরিকল্পিত সড়ক, সেতু ও বাজার অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে নেছারাবাদ আবারও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জনপদে পরিণত হতে পারে।

একসময়ের জমজমাট বাণিজ্যিক জনপদ নেছারাবাদ এখন তাই উন্নয়নের অপেক্ষায়। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—বাস্তব ও পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হবে স্বরূপকাঠির কাঠের মোকাম, মিয়ারহাট-ইন্দুরহাটের বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্য এবং নেছারাবাদের শতবর্ষের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য।

বিষয় : পিরোজপুর পিরোজপুর

জিবিএন বাংলা

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬


যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশায় মুখ থুবড়ে পড়ছে নেছারাবাদের অর্থনীতি

প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) একসময় ছিল দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাণবন্ত ব্যবসায়িক জনপদ। কাঠের মোকাম, পেয়ারা, ফার্নিচার, রশি, নারকেলের ছোবড়ার আঁশ, নার্সারি ও কৃষিপণ্য ব্যবসার পাশাপাশি নৌপথকেন্দ্রিক বাণিজ্যের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিল এ উপজেলার পরিচিতি। স্বরূপকাঠি, মিয়ারহাট ও ইন্দুরহাট বন্দরে প্রতিদিন ভিড় করতেন ব্যবসায়ী, পাইকার ও ক্রেতারা। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সড়ক ও সেতু যোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও নেছারাবাদ পিছিয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নয়ন বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে উপজেলার শতবর্ষের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে নেছারাবাদকে একাধিক সংসদীয় আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমে বানারীপাড়া–স্বরূপকাঠি, পরে ভাণ্ডারিয়া–কাউখালী–নেছারাবাদ এবং পিরোজপুর–নাজিরপুর–নেছারাবাদ আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে নেছারাবাদ–কাউখালী–ভাণ্ডারিয়া নিয়ে সংসদীয় আসনের বিন্যাস হয়েছে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, আশপাশের বানারীপাড়া, কাউখালী, ভাণ্ডারিয়া, নাজিরপুর ও পিরোজপুর সদর উপজেলায় গত দুই দশকে সড়ক, সেতু ও অবকাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও নেছারাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতুগুলো এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হয়নি। ফলে এর প্রভাব পড়ছে মানুষের চলাচল থেকে শুরু করে কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর।

বিশেষ করে সন্ধ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ের ছয়টি ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, এ অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য প্রধান সড়কের অভাব রয়েছে। অনেক সড়কের পিচ উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। বর্ষাকালে ভাঙা অংশে পানি জমে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। কোথাও পুরোনো সেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, আবার কোথাও সেতু নির্মাণ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় কাঠের সিঁড়ি দিয়ে মানুষকে সেতুতে উঠতে হয়।

অটোচালক রফিক বলেন, “বেশিরভাগ সড়কের পিচ উঠে গেছে। অসংখ্য খানাখন্দ রয়েছে। বর্ষায় পানি জমে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সড়ক ও সেতুর এই অবস্থার কারণে যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে।”

পশ্চিম পাড়ের বাসিন্দা তাহের বলেন, “আমাদের অঞ্চলে এমন একটি প্রধান সড়কও নেই, যেটাকে নির্ভরযোগ্য বলা যায়। এতে চলাচল, কৃষিপণ্য পরিবহন ও চিকিৎসাসেবায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”

যোগাযোগ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নেছারাবাদের ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতে। একসময় নাজিরপুর, বানারীপাড়া, উজিরপুর, কাউখালী ও ঝালকাঠিসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নিয়মিত স্বরূপকাঠি, মিয়ারহাট ও ইন্দুরহাটে আসতেন। কাঠ, কৃষিপণ্য, মাছ, ফলমূল ও আসবাবপত্রের বেচাকেনায় জমজমাট থাকত এসব বাজার।

কিন্তু আশপাশের উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে নতুন বাজার গড়ে ওঠায় বাইরের ক্রেতা ও পাইকারদের একটি বড় অংশ এখন নিজ নিজ এলাকার বাজার থেকেই পণ্য সংগ্রহ করছেন।

মুদিখানা ব্যবসায়ী জলিল বলেন, “আগে আশপাশের উপজেলা থেকে ক্রেতা ও পাইকাররা নেছারাবাদের বাজারে আসতেন। এখন অনেকেই নিজের এলাকার বাজার থেকেই পণ্য কিনে নিচ্ছেন। যোগাযোগ ভালো না থাকায় বাইরের ক্রেতাদের আগ্রহও কমে গেছে।”

নেছারাবাদের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে স্বরূপকাঠির কাঠের মোকাম। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকা ও ট্রলারে করে বিপুল পরিমাণ গোল কাঠ আসত এখানে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা স্বরূপকাঠি থেকে কাঠ কিনে নিয়ে যেতেন।

প্রবীণ কাঠ ব্যবসায়ী জব্বার মিয়া বলেন, “একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঠ এখানে আসত। পাইকাররা স্বরূপকাঠি থেকে কাঠ কিনে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যেতেন। এখন সেই আগের মতো বেচাকেনা নেই।”

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন কাঠ উৎপাদনকারী এলাকায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় পাইকাররা এখন সরাসরি উৎপাদন এলাকায় গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করছেন। অন্যদিকে নেছারাবাদের সঙ্গে বরিশাল, ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের স্থল যোগাযোগ এখনও দুর্বল। সংকীর্ণ সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু এবং বড় ট্রাক চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে কাঠ পরিবহন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে।

ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, “যোগাযোগের সমস্যার কারণে অনেক পাইকার এখন স্বরূপকাঠির মোকাম থেকে পণ্য না নিয়ে সড়ক যোগাযোগ সুবিধাসম্পন্ন উৎপাদন এলাকায় সরাসরি যাচ্ছেন।”

নেছারাবাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আরেকটি দিক হলো স্বরূপকাঠির বিসিক শিল্পনগরী। ১৯৬৪ সালে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীতে এখন পর্যন্ত মাঝারি বা বড় ধরনের উল্লেখযোগ্য শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। স্থানীয়দের মতে, উন্নত যোগাযোগ ও বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামোর অভাব শিল্পায়নের অন্যতম বাধা।

নেছারাবাদবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—নেছারাবাদ–বরিশাল ও নেছারাবাদ–পিরোজপুর সড়ক প্রশস্ত ও আধুনিকায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুর পরিবর্তে ভারী যান চলাচল উপযোগী নতুন সেতু নির্মাণ, পশ্চিম পাড়ের ছয় ইউনিয়ন সহ নেছারাবাদের সড়কগুল দ্রুত সংস্কার এবং পশ্চিম পাড় থেকে পিরোজপুরে সরাসরি বাস যোগাযোগ চালু করা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসব অবকাঠামো উন্নয়ন হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য, কাঠ, পেয়ারা, ফার্নিচার ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত ও কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে বাইরের পাইকার ও ক্রেতারা আবারও নেছারাবাদের বাজারমুখী হবেন এবং মিয়ারহাট, ইন্দুরহাট ও স্বরূপকাঠির হারানো বাণিজ্যিক গুরুত্ব ফিরে আসবে।

বর্তমান সংসদ সদস্য ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সোহেল মঞ্জুর সুমনকে ঘিরে উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, পিরোজপুর-২ (নেছারাবাদ–কাউখালী–ভাণ্ডারিয়া) আসনে তাঁর বিজয়ে নেছারাবাদের ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে তাঁর কার্যকর ভূমিকা চান তারা।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী সোহেল মঞ্জুর সুমন বলেন, “এই জনপদ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও অবগত। এখানে উন্নয়নে কতটা বৈষম্য হয়েছে, সেটিও তিনি জানেন। বিগত সরকার ১৭ বছরে এই অঞ্চলের কোনো কাজ করেনি। কাজ না করে উন্নয়নের অর্থ তুলে নিয়েছে। আমরা নিতে আসিনি, দিতে এসেছি।”

তিনি বলেন, “নেছারাবাদ উপজেলার ভোটারদের ভোটে আমি নির্বাচিত হয়েছি। মামলার কারণে এই এলাকার উন্নয়নের কাজ বন্ধ ছিল। ইনশাআল্লাহ, সেই মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। খুব শিগগিরই উন্নয়নের কাজ শুরু হবে।”


প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “সন্ধ্যা নদীর ওপর নেছার উদ্দিন সেতু ও কাউখালী–নেছারাবাদ চ্যানেলে সেতু নির্মাণের কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। এছারাও এই উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমী, খেলার জন্য স্টেডিয়াম সহ নানা মুখী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হবে, নেতাকর্মী ও আমলাদের প্রতি অনুরোধ, কেউ উন্নয়নের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। যেখানে যতটুকু কাজ করা যায়, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন।”তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি কাজের সহযোগিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

ফিরতে পারে হারানো বাণিজ্যিক গৌরব

স্থানীয় ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমজীবীদের মতে, নেছারাবাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক করা গেলে কাঠ, কৃষিপণ্য, পেয়ারা, নার্সারি, ফার্নিচারসহ ঐতিহ্যবাহী খাতগুলো আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

কৃষক ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ী রমেশ বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে আমাদের পণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া যাবে। পরিবহন খরচ কমবে এবং বাইরের পাইকাররা আবারও আসবেন। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই লাভবান হবে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি আরও কমবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হবে এবং সরকারও হারাবে রাজস্ব। অন্যদিকে পরিকল্পিত সড়ক, সেতু ও বাজার অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে নেছারাবাদ আবারও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জনপদে পরিণত হতে পারে।

একসময়ের জমজমাট বাণিজ্যিক জনপদ নেছারাবাদ এখন তাই উন্নয়নের অপেক্ষায়। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—বাস্তব ও পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হবে স্বরূপকাঠির কাঠের মোকাম, মিয়ারহাট-ইন্দুরহাটের বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্য এবং নেছারাবাদের শতবর্ষের ব্যবসায়িক ঐতিহ্য।


জিবিএন বাংলা

সম্পাদকঃ গোলাম কিবরিয়া তালুকদার
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ জুবায়েদ ইসলাম
প্রকাশকঃ মিজানুর রহমান মুন্সী

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত জিবিএন বাংলা
যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশায় মুখ থুবড়ে পড়ছে নেছারাবাদের অর্থনীতি
0:00 0:00
1.0x