বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন যদি দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—দলীয় প্রতীক না থাকলে আবার দলীয়ভাবে প্রার্থী বাছাই বা সমর্থনের যৌক্তিকতা কতটুকু?
এই প্রশ্নটি শুধু বিএনপির জন্য নয়; এটি সব রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রযোজ্য।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা উপজেলা নির্বাচনে ভোটাররা অনেক সময় দল নয়, ব্যক্তিকে বিবেচনা করেন। একজন প্রার্থীর সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, মানুষের পাশে থাকার ইতিহাস এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এমন বাস্তবতায় যদি কোনো দল কেন্দ্রীয়ভাবে একজনকে "দলীয় প্রার্থী" হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে দুটি প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্রথমত, দলীয় প্রতীক না থাকলে সেই সমর্থনের সাংগঠনিক মূল্য কতটুকু?
দ্বিতীয়ত, এতে কি দলের ভেতরের প্রতিযোগিতা কমবে, নাকি আরও বাড়বে?
বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, একই রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করেছেন, সামাজিক সম্পর্ক গড়েছেন এবং নিজ নিজ সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। ফলে একজনকে অগ্রাধিকার দিলে অন্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে বিএনপির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, বিভিন্ন সময়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধের আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন নয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করেন, অনেক এলাকায় স্থানীয় কমিটি নিয়ে বিতর্ক, অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যদি ওপর থেকে একজনকে সমর্থন দেওয়া হয়, তাহলে সব স্তরের নেতা-কর্মী সেই সিদ্ধান্ত একইভাবে গ্রহণ করবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ফলে একটি বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়—একই রাজনৈতিক ধারার একাধিক প্রার্থী মাঠে থেকে গেলে ভোট বিভক্ত হতে পারে। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অল্প ব্যবধানই অনেক সময় ফল নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে, যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিরা দলীয় প্রতীক ছাড়াই স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচন করেন এবং আইন অনুযায়ী প্রার্থী হতে পারেন, তাহলে বহু এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বহুমাত্রিক হতে পারে। একইভাবে জামায়াত বা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এবং শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও সুযোগ পেতে পারেন, বিশেষ করে যেখানে বড় দুই ধারার ভোট বিভক্ত হবে। তবে এর মাত্রা এলাকা ভেদে ভিন্ন হবে; এটি সর্বজনীন কোনো নিয়ম নয়।
তাহলে প্রশ্ন হলো—দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দলের কৌশল কী হওয়া উচিত?
একটি বিকল্প হতে পারে, আনুষ্ঠানিকভাবে একজনকে "দলীয় প্রার্থী" ঘোষণা করার পরিবর্তে দল সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্য কিছু নীতিগত মানদণ্ড নির্ধারণ করবে—যেমন সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সুনাম, জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা। স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে এবং মতবিরোধ আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে এনে দল তার রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে পারে।
অন্য একটি পথ হতে পারে স্থানীয় পর্যায়ে জরিপ, মতামত সংগ্রহ বা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এতে মনোনয়ন-পরবর্তী অসন্তোষ কিছুটা হলেও কমতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত জনগণের সবচেয়ে কাছের সরকার গঠনের নির্বাচন। এখানে ব্যক্তি, সেবা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামাজিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীক না থাকলে বাস্তবে প্রতিযোগিতা আরও বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। তাই দলীয় সমর্থন দেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—তারা কি একটি প্রার্থীকে শক্তিশালী করছেন, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের সমর্থনভিত্তিক ভোটকে একাধিক অংশে ভাগ করে দিচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোন দল সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে পরিণত সিদ্ধান্ত নিতে পারল।